আল্লাহ পাক-এর হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, “মুহম্মদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ পাক-এর রসূল ব্যতীত নন।” (সূরা আলে ইমরান/১৪৪)
আর আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “সাবধান হয়ে যাও, আমি হলাম আল্লাহ পাক-এর হাবীব।” (তিরমিযী, দারিমী, মিশকাত) অর্থাৎ আখিরী রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ পাক-এর নবী, রসূল ও হাবীব হিসেবেই সৃষ্টি হয়েছেন। যেমন, হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “হযরত মাইসারাতুল ফজর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি তখনও নবী ছিলাম যখন হযরত আদম আলাইহিস সালাম রূহ ও শরীরে ছিলেন।” (তারীখে বুখারী, আহমদ, আলহাবী, ইত্তেহাফুচ্ছাদাত, তাযকেরাতুল মাউজুয়াত, কানযুল উম্মাল, দাইলামী, ত্ববরানী, আবু নঈম, মিশকাত, মিরকাত)।
হাদীছ শরীফ-এ আরো ইরশাদ হয়েছে, “হযরত মুতররফ বিন আব্দুল্লাহ ইবনিশ শিখখির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “আমি তখনও নবী, যখন হযরত আদম আলাইহিস সালাম রূহ ও মাটিতে ছিলেন।” (ইবনে সা’দ, কানযুল উম্মাল)
কাজেই যিনি নবী, রসূল ও হাবীব হিসেবে সৃষ্টি হয়েছেন, উনার সম্পর্কে একথা কি করে বলা যেতে পারে যে, উনার ব্যক্তিগত যিন্দিগী রয়েছে? প্রকৃতপক্ষে উনার সম্পূর্ণ হায়াত মুবারকই নুবুওয়াতী, রিসালতী ও হাবীবী যিন্দিগী মুবারক। কোন নবী কিংবা রসূল আলাইহিমুস সালামগণের ব্যক্তিগত হায়াত মুবারক রয়েছে এ প্রকারের প্রশ্ন করা ও আক্বীদা পোষণ করা উভয়টাই কাট্টা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।
যদি বলা হয়, কোন নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম-এর ব্যক্তিগত যিন্দিগী রয়েছে, তাহলে এটা প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি কখন নবী হিসেবে থাকেন আর কখন সাধারণ ব্যক্তি হিসেবে থাকেন? অর্থাৎ তিনি কত সময়ব্যাপী নবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আর কত সময়ব্যাপী ব্যক্তি হিসেবে ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালন করেন? যা কস্মিনকালেও প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
আমরা কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস দ্বারা প্রমাণ পাই যে, নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণের প্রতি চব্বিশ ঘণ্টাই ওহী নাযিল হয়েছে। অর্থাৎ নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিলেন। যেমন এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহী ব্যতীত নিজের থেকে কোন কথা বলেননি।” (সূরা নজম/৩, ৪)
মহান আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেন, “কেউ যদি আমার নামে বানিয়ে কোন কথা বলে, তবে আমি আমার দক্ষিণ হস্ত দ্বারা ধরে তার গ্রীবা বা প্রাণ রগ কেটে দিব, তোমাদের কেউই এতে বাধা দিতে পারবে না।” (সূরা হাক্কা- ৪৪,৪৫,৪৬)
উপরোক্ত আয়াত শরীফ-এর শানে নুযূল সম্পর্কে বর্ণিত রয়েছে যে, কাফির, মুশরিকরা বলতো, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাকি আল্লাহ পাক-এর নাম মুবারকে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলেন। (নাঊযুবিল্লাহ) এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক এ আয়াত শরীফ নাযিল করে জানিয়ে দিলেন, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনই আল্লাহ পাক-এর নাম মুবারকে মিথ্যা বলেন না। শুধু এতটুকুই নয় আরো জানিয়ে দিলেন, যারা আল্লাহ পাক-এর নাম মুবারকে মিথ্যা বলবে তাদের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড।
আরো উল্লেখ্য, নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম-এর স্বপ্নও ওহীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর বহু প্রমাণ রয়েছে। যেমন- আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, “হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস্ সালাম বলেন, হে আমার ছেলে! (হযরত ইসমাইল আলাইহিস্ সালাম) নিশ্চয়ই আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম যে, আমি আপনাকে যবেহ (কুরবানী) করছি।” (সূরা ছফফাত/১০২)
অতঃপর হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম উনার ছেলে হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে মিনাতে শোয়ায়ে কুরবানী করার উদ্দেশ্যে গলা মুবারকে ছুড়ি চালাচ্ছিলেন। তখন আল্লাহ পাক পুনরায় নাযিল করলেন, “নিশ্চয়ই আপনি আপনার স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছেন।” (সূরা ছফফাত/১০৫)
কোন নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামগণেরই ব্যক্তিগত হায়াত বলতে কোন হায়াতই ছিলনা। উনাদের সম্পূর্ণ হায়াত মুবারকই ছিলো নুবুওয়াতী ও রিসালতী হায়াত মুবারক। সুতরাং ব্যক্তিগত হায়াত ছিল বলে মত পোষণ করা ও বিশ্বাস করা উভয়টাই কাট্টা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।
কাজেই হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতিটি আদেশ নির্দেশই অবশ্য পালনীয় বা অনুসরণীয়। কারণ তা ওহীর অন্তর্ভুক্ত। যেমন এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, “আল্লাহ পাক-এর কসম! তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের প্রত্যেক বিষয়ে আল্লাহ পাক-এর রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে না নিবে।” অর্থাৎ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতিটি ফায়সালাই নুবুওয়াতী ফায়সালা বা ওহীর ফায়সালা।
তাই হাদীছ শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে,হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণকে বললেন, “আমি যা বলি তোমরা তা লিপিবদ্ধ করে রেখো। একজন ছাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রসূল্লাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি অনেক সময় জামালী থাকেন আবার অনেক সময় জালালী থাকেন কোন সময়েরটা লিপিবদ্ধ করবো? হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি জামালী বা জালালী অর্থাৎ খুশি বা গোস্বা যে অবস্থায় থাকি না কেন সর্বাবস্থায়ই আমি নবী ও রসূল।”
তাহলে হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যক্তিগত হায়াত মুবারক রয়েছে একথা বলা কি করে শরীয়তসম্মত হতে পারে?
No comments:
Post a Comment