Wednesday, January 20, 2016

যারা বলে, ‘সিনা মুবারক চাক করে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার ভিতর থেকে খারাপ জিনিস ফেলে দেয়া হয়েছে’ তাদের এ বক্তব্য কুফরীর অন্তর্ভুক্ত।


ছহীহ ও বিশুদ্ধ মতে, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সিনা মুবারক চাক করা হয়েছিলো চার বার। প্রথমবার তিনি স্বীয় দুধ মা হযরত হালিমা সা’দিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-এর লালন-পালনে, তখন তাঁর বয়স মুবারক তিন থেকে পাঁচ বছর ছিলো। দ্বিতীয়বার দশ থেকে চৌদ্দ বছর বয়স মুবারকে, তৃতীয়বার আনুষ্ঠানিকভাবে নুবুওওয়াত ঘোষণার সময় হেরা গুহায় এবং চতুর্থবার মি’রাজ শরীফ-এর রাতে কাবা শরীফ-এ।
আল্লাহ পাক কুরআন শরীফ-এ ইরশাদ করেছেন, “হে আমার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি কি আপনার বক্ষ মুবারক প্রশস্ত (চাক) করিনি? অর্থাৎ আপনার বক্ষ (সিনা) মুবারক চাক করেছি। (সূরা আলাম নাশরাহ- ১)
বদ আক্বীদা ও বাতিল ফিরক্বার লোকেরা বলে থাকে যে, “হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রথমবার সিনা মুবারক চাকের সময়, উনার ভিতর থেকে ক্বলব মুবারক বের করে তা ফেড়ে শয়তানের অংশ বের করে ফেলে দিয়ে ক্বলবকে পবিত্র করা হয়েছিলো।” (নাঊযুবিল্লাহ)


তাদের এ বক্তব্য অজ্ঞতাসূচক এবং হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ইহানতসূচক যা কাট্টা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। কেননা, কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াস তথা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা মতে, নবী-রসূল আলাইহিমুস্‌ সালামগণ সমস্ত প্রকার খারাপ বিষয় এবং অপবিত্রতা থেকে সম্পূর্ণরূপে পুতঃপবিত্র। এমনকি পবিত্র থেকে পবিত্রতম। কিন্তু গুমরাহ লোকেরা হাদীছ শরীফ-এর সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই এ সম্পর্কে কুফরীমূলক বক্তব্য প্রদান করে থাকে।

‘ছহীহ মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ, মুছান্নিফ ইবনে আবী শাইবাহ’ ইত্যাদি কিতাবে বর্ণিত আছে, “হযরত আনাস বিন মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা হযরত জিবরীল আলাইহিস্‌ সালাম হযরত রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার নিকট এমন অবস্থায় আসলেন যে, যখন তিনি বালকদের সাথে অবস্থান করছিলেন। তিনি (হযরত জিবরীল আলাইহিস্‌ সালাম) উনাকে ধরলেন এবং আদবের সাথে মাটিতে চিৎ করে শোয়ালেন। অতঃপর সিনা মুবারক ফেড়ে ক্বলব মুবারক বের করে উহার মধ্য থেকে একখণ্ড পবিত্র গোশত মুবারক বের করলেন। অতঃপর হযরত জিবরীল আলাইহিস্‌ সালাম বললেন, “এটা শয়তান ওয়াস্‌ওয়াসা দেয়ার স্থান, (যা আপনার জন্য নয়, কারণ আপনি শয়তানী ওয়াস্‌ওয়াসা থেকে সম্পূর্ণরূপে মাহফুয। আপনার উম্মতের এই স্থানে শয়তান ওয়াস্‌ওয়াসা দিয়ে থাকে।) এরপর হযরত জিবরীল আলাইহিস্‌ ওয়া সাল্লাম সেটা স্বর্ণের পাত্রে যমযমের পানি দ্বারা ধুলেন। তৎপর উহার অংশগুলো একত্রিত করে যথাস্থানে রেখে দিলেন। এ অবস্থা দেখে অন্যান্য বালকরা উনার আম্মা আলাইহাস্‌ সালাম-এর নিকট বললেন, নিশ্চয়ই সাইয়্যিদুনা হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শহীদ করা হয়েছে। অতঃপর উনারা সকলেই এসে উনাকে উৎকৃষ্ট বর্ণে দেখতে পেলেন। হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, আমি (পরবর্তীতে) হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সিনা মুবারকের সিলাইয়ের চিহ্ন দেখেছি।”

বদ আক্বীদা ও বাতিল মাযহাবের লোকেরা উক্ত হাদীছ শরীফ-এর শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করে বলে থাকে যে, “হে আল্লাহ পাক-এর রসূল! এ অংশটি আপনার মধ্যে শয়তানের অংশ।” (নাঊযুবিল্লাহ)

এখানে শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করা যাবে না বরং তা’বীলী তথা ব্যাখ্যামূলক অর্থ গ্রহণ করতে হবে। কারণ, যে সকল শব্দের সরাসরি অর্থ করলে আল্লাহ পাক ও তাঁর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শানের খিলাফ হয়, সে সকল শব্দের সরাসরি অর্থ করলে কুফরী হবে। বরং সেক্ষেত্রে তা’বীলী বা ব্যাখ্যামূলক অর্থ করতে হবে। অনুসরণীয় ইমাম-মুজতাহিদগণ সকলেই এরূপ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা’বীলী বা ব্যাখ্যামূলক অর্থ গ্রহণ করেছেন।

‘সূরা বাক্বারা’-এর ৫৪ নম্বর আয়াত শরীফ উল্লেখ করে বলেন, এ আয়াত শরীফ-এর শাব্দিক বা সরাসরি অর্থ হলো, “আর কাফিরেরা ধোঁকাবাজী করলো, আল্লাহ পাকও ধোঁকাবাজী করলেন, আর আল্লাহ পাক হচ্ছেন উত্তম ধোঁকাবাজ।” (নাঊযুবিল্লাহ)এরূপ অর্থ যে কুফরীর অন্তর্ভুক্ত, এ ব্যাপারে কারোই কোনরূপ দ্বিমত নেই। কারণ, আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা মতে মহান আল্লাহ পাক ‘মকর’ বা ‘ধোঁকাবাজী’ হতে সম্পূর্ণই পবিত্র। অথচ দুনিয়ার সকল লুগাত বা অভিধানসমূহেই ‘মকর’ শব্দের অর্থ- ‘ধোঁকাবাজী’ বলে উল্লেখ আছে।  

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কাফিরদের ন্যায় মহান আল্লাহ পাক-এর শান মুবারকেও ‘মকর’ শব্দের উক্ত অর্থ গ্রহণ করা জায়িয হবে কি? মূলতঃ তা কস্মিনকালেও জায়িয হবে না। কারণ, তা মহান আল্লাহ পাক-এর শান ও ছহীহ আক্বীদার সম্পূর্ণই খিলাফ।

তাই উক্ত আয়াত শরীফ-এর তা’বীলী অর্থ করতে হবে। আর তা হলো- “আর কাফিরেরা ধোঁকাবাজী করলো, আল্লাহ পাক হিকমত করলেন, আর আল্লাহ পাক হচ্ছেন উত্তম হিকমতওয়ালা।”

তাই উল্লিখিত আয়াত শরীফসমূহের তা’বীলী অর্থের মতই আমাদের আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের ইমামগণের মতে উক্ত হাদীছ শরীফখানার সঠিক ও তা’বীলী অর্থ হলো, “এটা শয়তান ওয়াস্‌ওয়াসা দেয়ার স্থান, যা আপনার জন্য নয়। কারণ, আপনি শয়তানী ওয়াস্‌ওয়াসা থেকে সম্পূর্ণরূপে মাহফুয। আপনার উম্মতের এই স্থানে শয়তান ওয়াস্‌ওয়াসা দিয়ে থাকে।”
আল্লাহ পাক-উনার নির্দেশ অমান্য করে চরম বেয়াদবীর কারণে ইবলিস যখন কাফির, মালউন ও শয়তান হয়ে গেলো, তখন সে আল্লাহ পাককে বলেছিলো, আমি আপনার বান্দাদেরকে বিভিন্নভাবে পথভ্রষ্ট করবো, কিন্তু যাঁরা আপনার মুখলিছ, একনিষ্ঠ, মাহবুব বান্দা তাঁদেরকে গুমরাহ করতে পারবো না এবং উনাদেরকে ওয়াস্‌ওয়াসার জন্য কাছেও যেতে পারবো না।

কুরআন শরীফ-এ ইরশাদ হয়েছে, “আয় আল্লাহ পাক! যারা আপনার মুখলিছ, একনিষ্ঠ বান্দা, তাঁদেরকে আমি পথভ্রষ্ট করতে পারবো না।” (সূরা হিজর-৪০) এ আয়াত শরীফ-এর তাফসীরে ‘তাফসীরে খাযিন’-এর তৃতীয় খণ্ডের ৯৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “কিন্তু যারা আপনার মুখলিছ বান্দা তাঁদেরকে আমি পথভ্রষ্ট করতে পারবো না।” অর্থাৎ মু’মিন-মুসলমানগণের মধ্যে যারা তাওহীদ ও রিসালত সম্পর্কে আক্বীদা শুদ্ধ করবে, সঠিকভাবে শরীয়তের ইত্তিবা করবে এবং ইবাদত-বন্দিগী ইখলাছের সাথে একমাত্র আপনার জন্য করবে আমি তাঁদেরকে ওয়াস্‌ওয়াসা দিয়ে পথভ্রষ্ট করতে পারবো না।

উপরোক্ত আয়াত শরীফ এবং তার তাফসীর বা ব্যাখ্যা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, যাঁরা মুখলিছ বান্দা, শয়তান তাঁদেরকে ওয়াস্‌ওয়াসা দিতে পারবে না এবং গুমরাহ করতে পারবে না।

তাহলে যাঁরা নবী-রসূল এবং বিশেষভাবে নবী ও রসূলগণের সাইয়্যিদ, আখিরী রসূল, হাবীবুল্লাহ, নূরে মুজাস্‌সাম হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- উনার মধ্যে কিভাবে শয়তানের অংশ বা ওয়াস্‌ওয়াসা থাকতে পারে। কারণ, তিনি তো পরিপূর্ণভাবে ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অতএব, হাদীছ শরীফ-এর উক্ত অংশের তা’বীলী বা ব্যাখ্যামূলক অর্থ করতে হবে। সরাসরি অর্থ করলে কুফরী হবে।

‘যারকানী আলাল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়া’ কিতাবে উল্লেখ আছে, হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত ‘এটা শয়তানের অংশ’ এর অর্থ হচ্ছে- এটা ঐ স্থান, শয়তান যেখানে পৌঁছে বা মিলিত হয়ে মানুষকে বা আপনার উম্মতকে ধোকা দিয়ে থাকে। আপনার জন্য এই স্থানটি শয়তানের ওয়াস্‌ওয়াসার স্থান নয়। কারণ, আপনি শয়তান থেকে সম্পূর্ণরূপে মাহফুয।

‘আল্‌ ইনসানুল কামিল’ কিতাবে উল্লেখ আছে, “বর্ণিত হাদীছ শরীফ-এর মর্মার্থ হলো এই যে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে শয়তানের কোন অংশই ছিলো না।”

‘তাফসীর ফী গারাইবিল কুরআন ওয়ার্‌ রগাইবিল ফুরক্বান’ কিতাবে উল্লেখ আছে, “হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্য ছাড়া কিছু দেখেন না, সত্য কথা ছাড়া কিছু বলেন না এবং আল্লাহ পাক-উনার জন্য ছাড়া অন্য কারো জন্য কোন ইবাদত করেন না। মুহাক্কিক, ইমাম-মুজতাহিদগণ বলেন, উনার ক্বলবে শয়তানের কোন পথ বা স্থান নেই বা ছিল না। এজন্যই আল্লাহ পাক এভাবে বলেননি যে, “আমি কি আপনার ক্বলব প্রশস্ত (চাক) করি নাই? বরং বলেছেন, আমি কি আপনার বক্ষকে প্রশস্ত (চাক) করি নাই?”

উক্ত হাদীছ শরীফ-এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, আপনি ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অতএব আপনার মধ্যে শয়তানের কোন অংশ নেই। কারণ আপনি সম্পূর্ণরূপে মাহফুয ও মা’ছূম। বরং আদম সন্তানের এই স্থান থেকেই শয়তান তাদেরকে ওয়াস্‌ওয়াসা দেয়।

মুলকথা হলো, আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভিতর থেকে শয়তানের অংশ বা হিংসা-বিদ্বেষ বের করা হয় নাই। কেননা তিনি তো আল্লাহ পাক-এর গুণে গুণান্বিত বা আল্লাহ পাক-এর চরিত্রে চরিত্রবান। কাজেই আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার ভিতরে শয়তানের অংশ থাকার প্রশ্নই উঠে না। অতএব, উনার ভিতর নাপাক কিছু কল্পনা করাও কুফরী।
হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার ভিতর থেকে সিনা চাকের সময় নাপাক কিছু বের করা হয়নি। বরং পবিত্রস্থানটি বের করে উম্মতের মহান আদর্শ হিসেবে উম্মতের শিক্ষার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষভাবে স্মরণীয় যে, আল্লাহ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাথার তালু মুবারক থেকে পায়ের তলা মুবারক পর্যন্ত যা কিছু রয়েছে অর্থাৎ সমস্ত কিছুই শুধু পবিত্রতমই নয় বরং এতটুকু পবিত্র যে, যা অপবিত্রকে পবিত্র করে দেয়। এমনকি উনার শরীর মুবারক থেকে নিঃসৃত কোন কিছু যদি কেউ খায় বা পান করে তাহলে তার জন্য জাহান্নাম হারাম হয়ে জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। (সুবহানাল্লাহ)

No comments:

Post a Comment